মোঃ রায়হান হোসেন: সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের সরকারি দপ্তর নয়, বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় এখন পরিণত হয়েছে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহী অপকর্মের এক ভয়ংকর অভয়ারণ্যে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন কিংবা নতুন অন্তর্ভুক্তি প্রতিটি ফাইলের নড়াচড়ায় টেবিল থেকে টেবিলে চলছে বেপরোয়া দরকষাকষি। দুর্নীতির এই নগ্ন মহোৎসবের প্রমাণ আর কোনো গুঞ্জনে সীমাবদ্ধ নেই; কার্যালয়ের অফিস সহায়ক (পিয়ন) তপন দাসের একের পর এক তিনটি চাঞ্চল্যকর গোপন রেকর্ড তদন্ত রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে, তাতে পরিষ্কার ফাঁস হয়ে গেছে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আহসান ইকবাল ও তাঁর নিয়োজিত কর্মচারীদের গড়ে তোলা দুর্নীতির পুরো সিন্ডিকেট। শুধু সাধারণ নাগরিকদের পকেট কাটাই নয়, বিপুল অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ভোটার বানানোর মতো চরম দেশবিরোধী অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে এই দপ্তর।
ফাঁস হওয়া রেকর্ডের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কার্যালয়ের ভেতরের চেয়ারে বসে অত্যন্ত দম্ভভরে এক সেবাপ্রত্যাশীর সাথে ঘুষের দরদাম করছেন অফিস সহায়ক তপন দাস। একপর্যায়ে সেবাগ্রহীতাকে প্রলুব্ধ করে তপন বুক ফুলিয়ে বলেন, “আপনি আমার লগে কাম করলে কাম কইরা মজা পাইবা। এইটা ১০০ পারসেন্ট গ্যারান্টি। এর চেয়ে কমে পাইলে অন্য জায়গায় দিবা।”
পরবর্তী রেকর্ড ভিডিওতে এই দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও খোদ নির্বাচন কর্মকর্তার হিস্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন তিনি। তপন স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন, বর্তমান নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আহসান ইকবাল যোগদানের পর ঘুষের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সেবাপ্রার্থীকে রেটকার্ড বুঝিয়ে দিয়ে তপন বলেন
“আগে কমাই নিতাম। এখন যে নতুন স্যার আইছে, আইনরে দেওন লাগে তিন (৩ হাজার টাকা)। ওরে দুই দিলে হইয়া লাভ নাই। আপনি আমারে ৩৫০০ দিলে ৫০০ টাকা আমার, ৩০০০ টাকা স্যারের। ৩৫০০ দিলে আমার কাছে কোনো কাজ পেন্ডিং থাকতো না ভাই।”
তৃতীয় রেকর্ড ভিডিওটিতে ঘুষের প্রক্রিয়াকে প্রকাশ্য ‘ব্যবসায়িক অংশীদারি’ হিসেবে উপস্থাপন করেন এই পিয়ন। দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা দেওয়ার টোপ ফেলে তিনি বলেন, “আমি আপনের লগে ব্যবসা করলে দীর্ঘ দিন করতাম। স্যাররে দুই, আপনে এক…।” এমনকি এই রেট পরিবর্তন অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি যোগ করেন, “উনি (নির্বাচন কর্মকর্তা) যদি বদলি হইয়া যায় মনে করেন তইলে একটু কমে আইবো।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আহসান ইকবালকে কেন্দ্র করে কার্যালয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রের ফিল্ড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অফিস সহায়ক তপন দাস এবং অফিসের নাইটগার্ড (নৈশপ্রহরী) দুলাল মিয়া।
নির্বাচন কর্মকর্তা নিজে পর্দার আড়ালে অবস্থান করে সাধারণ মানুষের ফাইল আটকে রাখেন এবং এই দুই নিম্নপদস্থ কর্মচারীর মাধ্যমে অর্থ লেনদেন নিশ্চিত করেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন কর্মকর্তা নিজের দাপ্তরিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় নির্বাচন সার্ভার ও কম্পিউটারের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন নাইটগার্ড দুলাল ও পিয়ন তপনের হাতে। ৩ থেকে ৫ হাজার টাকার চুক্তি সম্পন্ন হলে কোনো ধরণের বৈধ কাগজপত্র কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির (চেয়ারম্যান-মেম্বার) সত্যায়ন ছাড়াই রাতে ও দিনে টেবিল সাজিয়ে ফাইল চূড়ান্ত করে দেন নৈশপ্রহরী ও পিয়ন। আর টাকা না দিলে মাসের পর মাস ঘুরিয়ে সেবাগ্রহীতাদের করা হয় মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত।
এই সিন্ডিকেটের অপরাধ কেবল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাস আগে বটতলী এলাকায় টাকার বিনিময়ে অবৈধ রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়ে। এই জালিয়াতি উন্মোচিত হওয়ার পর সিলেট থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভিনদেশি রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশের ভোটার পরিচয়পত্র তুলে দেওয়ার মূল অভিযোগের তির উঠেছে স্বয়ং নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আহসান ইকবালের দিকে। রাষ্ট্রের গোপন সার্ভার বহিরাগত ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে এমন রাষ্ট্রদ্রোহী অপকর্ম নির্বিঘ্নে চালানো হচ্ছে বলে স্থানীয় মহলের স্পষ্ট অভিযোগ।
নির্বাচন অফিসে সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ঘুষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চরম হেনস্তার শিকার হওয়া ভুক্তভোগী বাবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন নিয়ে গেলে তারা সরাসরি মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় কর্মকর্তা এবং তাঁর নিয়োজিত কর্মচারীরা আমার সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করে অফিস থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এই অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গেলে কিংবা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ওপরও আক্রমণাত্মক ও চরম উদ্ধত আচরণ প্রদর্শন করেন নির্বাচন কর্মকর্তা ও তাঁর পেটোয়া কর্মচারীরা।
প্রকাশ্য ঘুষ লেনদেনের ভিডিও ফাঁস এবং রোহিঙ্গা ভোটার কেলেঙ্কারির পর বিয়ানীবাজারজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। নাগরিক সমাজের মতে, একটি দায়িত্বশীল সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এমন অপকর্ম রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মুখে সরাসরি চপেটাঘাত।
অফিস সহায়ক (পিয়ন) তপন দাসের সাথে শনিবার রাতে যোগাযোগ করলে কর্ণপাত না করায় হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা মারফতে সংবাদের সারাংশ পাঠিয়ে বক্তব্য জানানোর আহ্বান করলেও সাড়াশব্দ মিলেনি। পরপর অফিসের নাইটগার্ড (নৈশপ্রহরী) দুলাল মিয়ার সাথে যোগাযোগ করলে তার সেলফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে একই দিন রাত ৯টা ৪ মিনিটের সময় নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আহসান ইকবালের ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য মিলেনি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আহসান ইকবাল, অফিস সহায়ক তপন দাস এবং নৈশপ্রহরী দুলাল মিয়াসহ জড়িত পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।